Ad

Ad

সকালে নাকি রাতে ব্যায়াম? গবেষণা কী বলছে জানুন

ভূমিকা: আপনি কি সকালে ব্যায়াম করেন, নাকি রাতে?

অনেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠে জগিং করতে যান। কেউ কেউ অফিস শেষে জিমে যান। কেউ বলেন সকালের ব্যায়াম দিনজুড়ে শক্তি দেয়, আবার কেউ বলেন রাতের ব্যায়াম ভালো ঘুম আনে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে দেখলে কোন সময় ব্যায়াম করলে শরীর সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়?

২০২৫ সালের বড় গবেষণাগুলো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। আজকের এই লেখায় আমরা জানবো সকালে নাকি রাতে ব্যায়াম—গবেষণা কী বলছে। চলুন দেখে নেই, আপনার লক্ষ্য অনুযায়ী কোন সময়টাই বা আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।

সকালের আলোয় প্রকৃতিতে ব্যায়াম করার দৃশ্য

বৈজ্ঞানিক গবেষণা কী বলছে?

ন্যাচার সায়েন্টিফিক রিপোর্টের ১২ সপ্তাহের গবেষণা

২০২৫ সালের মে মাসে বিশ্বখ্যাত জার্নাল Nature Scientific Reports-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা ৫৮ জন সেডেন্টারি (নিষ্ক্রিয়) প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে তিনটি দলে ভাগ করে ১২ সপ্তাহ ধরে পর্যবেক্ষণ করেছেন। একদল সকাল ৬ থেকে ৮টার মধ্যে ব্যায়াম করেছেন, আরেক দল সন্ধ্যা ৬ থেকে ৮টার মধ্যে। তৃতীয় দল কোনো ব্যায়াম করেননি।

ফলাফল চমকপ্রদ। দুই দলের শরীরেই পরিবর্তন দেখা গেছে, কিন্তু প্রতিটি সময় ভিন্ন ভিন্ন উপকারিতা এনেছে:

  • সকালের ব্যায়াম: ঘুমের সময় আগে এগিয়ে আসে, মেলাটোনিন রিদম উন্নত হয়, এবং শরীরের চর্বি দ্রুত কমে। বিশেষ করে পেটের ভেতরের ভিসেরাল ফ্যাট এবং ত্বকের নিচের সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাট উভয়ই কমেছে।
  • রাতের ব্যায়াম: মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাড়ে, রক্তনালীর নমনীয়তা উন্নত হয়, এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে।

চীনা কলেজ স্টুডেন্টদের ওপর গবেষণা

আরেকটি ২০২৫ সালের গবেষণায় ওভারওয়েট এবং স্থূলতার সমস্যায় ভোগা ৩১ জন চীনা কলেজ স্টুডেন্টকে দুই দলে ভাগ করা হয়। একদল সকাল ৭ থেকে ১০টার মধ্যে এবং আরেক দল সন্ধ্যা ৬ থেকে ৯টার মধ্যে ১০ সপ্তাহ ধরে ব্যায়াম করেছেন।

ফলাফল দেখা গেছে, সকালের ব্যায়ামকারীদের কোমরের পরিধি, কাঁধের চর্বি এবং হাতের চর্বি সন্ধ্যার ব্যায়ামকারীদের তুলনায় অনেক বেশি কমেছে। সকালের ব্যায়াম ওজন এবং BMI-ও দ্রুত কমিয়েছে, যেখানে রাতের ব্যায়ামে এই পরিবর্তন তেমন একটা দেখা যায়নি।

ফ্রন্টিয়ার্স ইন ফিজিওলজির গবেষণা

২০২৫ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, সকালের ব্যায়াম বিশেষ করে নাস্তার আগে করলে শরীর চর্বি পোড়াতে বেশি পছন্দ করে। রাতে ঘুমের পর শরীরের গ্লাইকোজেন (শর্করা) স্টোর কম থাকে, তাই ব্যায়ামের সময় শরীর সরাসরি চর্বি ব্যবহার করে জ্বালানি হিসেবে। এর ফলে ২৪ ঘণ্টা ধরে ফ্যাট অক্সিডেশন বেড়ে যায়।

বিকেলের ব্যায়ামের উপকারিতাও আছে

তবে সব গবেষণাই সকালকে সমর্থন করে না। ৯০,০০০-রও বেশি মানুষের ওপর সাত বছর ধরে করা একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, বিকেলের ব্যায়াম (বেলা ৪ থেকে ৬টার মধ্যে) হৃদরোগ এবং ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে বয়স্ক পুরুষ, কম সক্রিয় ব্যক্তি এবং যাদের হৃদরোগের ইতিহাস আছে, তাদের জন্য বিকেলের ব্যায়াম বিশেষ উপকারী।

বিকেলের সময় শরীরের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ হয়, পেশী নমনীয় থাকে এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা বেশি হয়। তাই শক্তি এবং সহনশীলতা বাড়ানোর জন্য বিকেল আদর্শ সময়।

জিমে বিকেলের ব্যায়ামের দৃশ্য

সকাল বনাম রাত—তুলনামূলক তালিকা

লক্ষ্য সকালের ব্যায়াম রাতের ব্যায়াম
ওজন কমানো বেশি উপকারী—চর্বি পোড়ানো বাড়ে কম উপকারী—কার্বোহাইড্রেট বেশি ব্যবহার হয়
ঘুমের মান ঘুমের সময় আগে এগিয়ে আসে, মেলাটোনিন বাড়ে ঘুমের মান উন্নত হয়, তবে খুব রাতে করলে বিঘ্ন ঘটতে পারে
হৃদস্বাস্থ্য রক্তচাপ কমায়, তবে সকালে হৃদরোগের ঝুঁকি সামান্য বেশি রক্তনালীর নমনীয়তা বাড়ায়, মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাড়ে
শক্তি ও সহনশীলতা শরীর ঠান্ডা থাকে, তাই ওয়ার্ম-আপ বেশি দরকার শরীর গরম এবং নমনীয়, তাই ভালো পারফরম্যান্স
নিয়মিততা দিনের শুরুতে করলে বাকি দিনে কিছু ঘটে না অফিস শেষে ক্লান্তিতে ব্যায়াম বাদ দেওয়ার ঝুঁকি
মানসিক স্বাস্থ্য দিনজুড়ে শক্তি এবং মনোযোগ বাড়ায় দিনের স্ট্রেস কমায় এবং মেজাজ ভালো করে

কাদের জন্য কোন সময়?

ওজন কমাতে চাইলে—সকাল

যদি আপনার লক্ষ্য ওজন কমানো, বিশেষ করে পেটের চর্বি কমানো, তাহলে সকালের ব্যায়াম আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। নাস্তার আগে ব্যায়াম করলে শরীর সরাসরি চর্বি ব্যবহার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সকালের ব্যায়ামকারীরা বেশি ক্যালোরি বার্ন করেন এবং দিনের বেলা কম ক্যালোরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হন।

শক্তি বাড়াতে চাইলে—বিকেল

যদি আপনার লক্ষ্য শক্তি বাড়ানো, ভারোত্তোলন বা হাই-ইন্টেনসিটি ইন্টারভ্যাল ট্রেনিং (HIIT), তাহলে বিকেল ৪ থেকে ৬টার মধ্যে ব্যায়াম করুন। এই সময় শরীরের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ, পেশী নমনীয় এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা ভালো থাকে।

হৃদরোগের ঝুঁকি থাকলে—বিকেল বা সন্ধ্যা

যাদের হৃদরোগ আছে বা ঝুঁকি আছে, তাদের জন্য বিকেল বা সন্ধ্যার ব্যায়াম নিরাপদ। সকালে রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে এবং প্লাটিলেট এগ্রিগেবিলিটি বেশি থাকে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে সকালের ব্যায়াম ধীরে ধীরে শুরু করলে এবং ওয়ার্ম-আপ ভালো করলে ঝুঁকি কমে।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকলে—বিকেল

টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিকেলের ব্যায়াম বিশেষ উপকারী। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিকেলের ব্যায়াম রক্তে শর্করার মাত্রা অন্য সময়ের তুলনায় ৩০-৫০ শতাংশ বেশি কমায়।

ঘুমের সমস্যা থাকলে—সকাল

যারা রাতে ঘুমাতে যেতে দেরি করেন বা ঘুমের মান খারাপ, তাদের জন্য সকালের ব্যায়াম আদর্শ। সকালের ব্যায়াম সারকাডিয়ান রিদমকে এগিয়ে দেয় এবং মেলাটোনিনের নিঃসরণ বাড়ায়, যা রাতে ভালো ঘুম আনতে সাহায্য করে।

উপকারিতা ও সতর্কতা

উপকারিতা

  • যেকোনো সময় ব্যায়ামই ভালো: গবেষণা বলছে, নিয়মিত ব্যায়াম না করার চেয়ে যেকোনো সময় ব্যায়াম করা অনেক ভালো।
  • সকালের ব্যায়াম: ওজন কমায়, ঘুমের মান উন্নত করে, দিনজুড়ে শক্তি দেয় এবং নিয়মিততা বাড়ায়।
  • রাতের ব্যায়াম: শক্তি বাড়ায়, স্ট্রেস কমায়, রক্তনালীর স্বাস্থ্য ভালো করে এবং মস্তিষ্কের রক্ত সরবরাহ বাড়ায়।
  • বিকেলের ব্যায়াম: হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং পারফরম্যান্স সর্বোচ্চ হয়।

সতর্কতা

  • খুব রাতে ব্যায়াম: ঘুমানোর কমপক্ষে ২-৩ ঘণ্টা আগে হাই-ইন্টেনসিটি ব্যায়াম শেষ করুন। না হলে ঘুমের মান খারাপ হতে পারে।
  • সকালে ওয়ার্ম-আপ: সকালে শরীর ঠান্ডা থাকে, তাই ভালোভাবে ওয়ার্ম-আপ করুন। না হলে ইনজুরির ঝুঁকি বাড়ে।
  • খালি পেটে ব্যায়াম: দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করলে একটু খেয়ে নিন। না হলে দুর্বলতা অনুভব হতে পারে।
  • হৃদরোগ থাকলে: সকালের ব্যায়ামের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সকালে হৃদরোগের ঝুঁকি সামান্য বেশি থাকে।

বিশেষজ্ঞ টিপ

"গবেষণা বলছে, সকাল এবং রাত—দুটো সময়ই ভিন্ন ভিন্ন উপকারিতা নিয়ে আসে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো—আপনি যে সময়েই ব্যায়াম করুন না কেন, নিয়মিততাই মূল কথা। এক সপ্তাহ সকালে, পরের সপ্তাহ রাতে—এভাবে করলে শরীরের সারকাডিয়ান রিদম বিঘ্নিত হয়। আমার পরামর্শ হলো, আপনার লক্ষ্য অনুযায়ী সময় বেছে নিন এবং সেটাই ধরে রাখুন। ওজন কমাতে চাইলে সকাল, শক্তি বাড়াতে চাইলে বিকেল, আর স্ট্রেস কমাতে চাইলে সন্ধ্যা। কিন্তু যেকোনো সময়ে ১৫০ মিনিট মাঝারি-তীব্রতার ব্যায়াম সপ্তাহে করুন—এটাই WHO-র নির্দেশিকা।"

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: সকালে ব্যায়াম করলে কি ওজন বেশি কমে?

হ্যাঁ, গবেষণায় দেখা গেছে সকালের ব্যায়াম বিশেষ করে নাস্তার আগে করলে শরীর চর্বি পোড়াতে বেশি পছন্দ করে। রাতে ঘুমের পর শরীরের গ্লাইকোজেন (শর্করা) স্টোর কম থাকে, তাই ব্যায়ামের সময় সরাসরি চর্বি ব্যবহার হয়। তবে রাতের ব্যায়ামও ওজন কমাতে সাহায্য করে, যদিও সকালের মতো দ্রুত নয়।

প্রশ্ন ২: রাতে ব্যায়াম করলে কি ঘুমের সমস্যা হয়?

হালকা থেকে মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম রাতে ঘুমের মান উন্নত করে। কিন্তু খুব তীব্র ব্যায়াম বা হাই-ইন্টেনসিটি ওয়ার্কআউট ঘুমানোর ২-৩ ঘণ্টা আগে করলে হার্ট রেট এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, যা ঘুমাতে যেতে অসুবিধা করতে পারে। তাই রাতে যোগা, স্ট্রেচিং বা হাঁটার মতো হালকা ব্যায়াম করুন।

প্রশ্ন ৩: ব্যায়ামের আগে কি খাওয়া উচিত?

সকালের ব্যায়ামের আগে একটু খেয়ে নিন—যেমন একটা কলা বা এক টুকরো রুটি। খালি পেটে দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করলে দুর্বলতা অনুভব হতে পারে। রাতের ব্যায়ামের আগে ১-২ ঘণ্টা আগে হালকা খাবার খান। ভারী খাবার ব্যায়ামের আগে এড়িয়ে চলুন।

প্রশ্ন ৪: একই সময়ে ব্যায়াম করতে হবে কি?

হ্যাঁ, সম্ভব হলে প্রতিদিন একই সময়ে ব্যায়াম করুন। এতে শরীরের সারকাডিয়ান রিদমের সাথে মিলে যায় এবং ব্যায়ামের ফল বেশি পাওয়া যায়। একদিন সকালে, একদিন রাতে করলে শরীর অভ্যস্ত হতে পারে না।

প্রশ্ন ৫: যাদের সময় নেই, তারা কী করবেন?

যে সময় পাবেন সেই সময়েই ব্যায়াম করুন। গবেষণা বলছে, নিয়মিত ব্যায়াম না করার চেয়ে যেকোনো সময় ব্যায়াম করা অনেক ভালো। তবে সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন। ছোট ছোট সময়েও ব্যায়াম করা যায়—যেমন লাঞ্চ ব্রেকে ১৫ মিনিট হাঁটা।

শেষ কথা

তাহলে উত্তরটি কী? সকালে নাকি রাতে ব্যায়াম—গবেষণা কী বলছে? উত্তর হলো—দুটোই ভালো, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন কারণে। ওজন কমাতে চাইলে সকাল, শক্তি বাড়াতে চাইলে বিকেল, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে চাইলে সন্ধ্যা, আর ঘুমের মান উন্নত করতে চাইলে সকাল।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো—আপনি যে সময়েই ব্যায়াম করুন না কেন, নিয়মিততাই মূল কথা। একদিন সকালে, পরের দিন রাতে—এভাবে নয়। একটা সময় বেছে নিন এবং সেটাই ধরে রাখুন। আর মনে রাখবেন, ব্যায়াম না করার চেয়ে যেকোনো সময় ব্যায়াম করা অনেক ভালো।

আজ থেকেই শুরু করুন—আপনার শরীর আপনাকে ধন্যবাদ জানাবে।

Disclaimer: এই লেখাটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো চিকিৎসা পরামর্শ নয়। কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা হলে অবশ্যই একজন যোগ্য ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।

📺 আরও জানতে চান? দেখুন: Morning vs Evening Workout: Which is Better?

Post a Comment

0 Comments